পুণ্য কাজে পরস্পরের প্রতিযোগিতা

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই:), খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস
২৭ অক্টোবর, ২০১৭

শুধু অডিও শুনুন

ডাউনলোড

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২৭শে অক্টোবর, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদ থেকে “পুণ্য কাজে পরস্পরের প্রতিযোগিতা”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন। তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর, হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তা’লা মুমিনদেরকে সবসময়ের জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা হল ‘ফাসতাবিকুল খাইরাত’ বা পুণ্য কাজে পরস্পরের প্রতিযোগিতা, আর মুমিন হবার পর পুণ্য সম্পাদনকারী বা পুণ্যবানদেরকে ‘খায়রুল বারিয়্যা’ বা সর্বোত্তম সৃষ্টি আখ্যা দান করেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এই আয়াত প্রসঙ্গে একস্থানে বলেন, মানুষের উচিত নিজের দায়িত্বাবলী পালন করা ও সৎকর্মে উন্নতি সাধন করা। অতএব, সৎকর্মের ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করা ও পুণ্যকাজ করাই একজন মুমিনকে প্রকৃত মুমিনে পরিণত করে। পুণ্য কী, প্রকৃত পুণ্য কিভাবে অর্জন করা যায়, পুণ্য সম্পাদনের জন্য আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস কেন আবশ্যক, বিশ্বাস বা ঈমানের মানদন্ড কেমন হওয়া উচিত, সেই মান কিভাবে বৃদ্ধি করা উচিত, পুণ্যের প্রকারভেদ, পুণ্যের ফলাফল কী হয় ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ই তিনি (আ.) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। হুযুর (আই.) এসব বিষয়ে মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতি তুলে ধরে বিষয়গুলো পুনর্ব্যক্ত করেন। পুণ্য কী? এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, পুণ্য হল ইসলাম ও আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছাবার এক সিঁড়ি। কিন্তু সেটি খুব কঠিন কাজ, কারণ শয়তান মানুষের প্রত্যেক উন্নতির পথেই ওঁত পেতে বসে থাকে। উদাহরণস্বরূপ যদি কারও বাড়িতে রাতে বেশি রুটি বানানোর ফলে পরদিন কিছু বাসি রুটি থেকে যায়, আর পরদিন সে নতুন রান্না করা খাবার খেতে বসলে কোন ভিক্ষুক এসে যদি খাবার চায়, তখন সে বাসি রুটি ভিক্ষুককে দিয়ে দিতে বলে- এটি মোটেও পুণ্য নয়। কারণ সেই রুটি তো এমনিই পড়ে থাকত, সে নিজে তো তা খেত না; এরূপ খাবার যা নিজের জন্য অপছন্দীয়, তা দিয়ে দেয়া মোটেই আল্লাহ্‌র নির্দেশ নয়। হ্যাঁ, যদি সে নিজের সামনের টাটকা খাবার থেকে ভিক্ষুককে দিয়ে দিত, তবে তা পুণ্য হতো; এরূপ গভীরতায় গেলে পরে প্রকৃত পুণ্য লাভ করা যায়। আর এরূপ পুণ্য লাভের জন্য আবশ্যক হল যেন আল্লাহ্‌র সত্ত্বায় পূর্ণ বিশ্বাস থাকে, এবং এই বিশ্বাস থাকে যে তিনি সর্বদা সবকিছু দেখছেন। কর্মের সংশোধনের জন্য এমন এক সত্ত্বার উপর বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন যিনি সর্বদা-সর্বাবস্থায় তার সব কথা,কাজ, এমনকি মনের কথারও সাক্ষী হবেন; আর এমনটি আল্লাহ্‌র সত্ত্বা ছাড়া আর কারও নেই। অতএব যদি এইরকম দৃঢ় ও গভীর বিশ্বাস যদি হয়, এভাবে যদি সর্বদা আল্লাহ্ মনে বিরাজমান থাকেন, কেবল তখনই প্রকৃত পুণ্য করা সম্ভব। এটি আরও স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি (আ.) বলেন, তাকওয়া মানে হল পাপের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় থেকেও বেঁচে চলা। কিন্তু এর মানে এই নয় যে একজন ব্যক্তি নিজেকে এজন্য পুণ্যবান দাবী করবে যে সে চুরি-ডাকাতি-খুন-ব্যভিচার-আত্মসাৎ ইত্যাদি পাপ করে না; এগুলো করলে তো সে আল্লাহ্‌র নিকট শাস্তিযোগ্য অপরাধী। প্রকৃত পুণ্য তো হল মানবজাতির সেবা করা ও আল্লাহ্‌র পথে পরিপূর্ণ সত্যপরায়ণতা ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করা, প্রয়োজনে এর জন্য প্রাণও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকা। পাপ হল আধ্যাত্মিক মৃত্যু; আর আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য কেবল পাপ পরিত্যাগ নয়, বরং প্রকৃত পুণ্য করা প্রয়োজন। আল্লাহ্‌র উপর ঈমান বা বিশ্বাসের মানদন্ড কেমন হওয়া উচিত সে প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি (আ.) বলেন, যেভাবে কেউ কোন গর্তে একটি বিষধর সাপকে প্রবেশ করতে দেখলে সেই গর্তে হাত ঢোকাতে সাহস পায় না যে হাত ঢোকালে মৃত্যু অনিবার্য, তেমনিভাবে আল্লাহ্‌র উপরও সেরূপ বিশ্বাস রাখতে হবে যে তিনি সবকিছু দেখছেন এবং সব কাজের হিসাব নিবেন। এভাবে যে ব্যক্তির অন্তর-বাহির এক হয়ে যায়, সেই ব্যক্তি ফেরেশতার মত হয়ে যায়। আল্লাহ্‌র উপর প্রকৃত বিশ্বাস স্থাপনকারী কোন পাপ করতেই পারে না; এটি সম্ভবই নয় যে এক ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সত্ত্বায়ও বিশ্বাসী হবে, আবার পাপও করবে। এটিই সেই লক্ষ্য যা মানুষের অভিষ্ট হওয়া দরকার, আর এটিই তিনি নিজ জামাতের জন্য লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সত্ত্বায় প্রকৃত বিশ্বাস আনয়ন। পুণ্যের দু’টি দিকের কথা তিনি (আ.) বর্ণনা করেছেন, একটি হল অন্যের ক্ষতি না করা, অপরটি অন্যের মঙ্গল করা। তিনি বলেন, অন্যের ক্ষতি না করলেই ঈমান পূর্ণ হয় না, এর সাথে অন্যের মঙ্গল সাধন যোগ হলে ঈমান পূর্ণাঙ্গ হয়। আর এটি তখন সম্ভব হয় যখন আল্লাহ্‌র গুণাবলীর উপর বিশ্বাস থাকে এবং সেগুলোর জ্ঞান থাকে। জাগতিক সরকারের ভয়ে যখন মানুষ আইন ভাঙা থেকে বিরত থাকে, তখন এটি কিভাবে হতে পারে যে জগতপতির ভয় সত্ত্বেও সে পাপ করে? আসলে আল্লাহ্‌র সত্ত্বায় বিশ্বাস নেই বলেই এমনটি করে। তাই পাপ থেকে বাঁচার জন্য প্রথম ধাপ হল আল্লাহ্‌র সত্ত্বায় খাঁটি বিশ্বাস, দ্বিতীয় ধাপ হল সেই পথের সন্ধান করা যা খোদার মনোনীত বান্দাদের পথ অর্থাৎ পুণ্য সাধন। আর এভাবে সেই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে হবে যখন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে পুণ্য সাধনের শক্তি ও সামর্থ্য তথা রূহুল কুদস লাভ হয়। যে ব্যক্তি এই রূহুল কুদস লাভ করে, তার জন্য পুণ্য করা অত্যন্ত আনন্দের ও সুস্বাদু হয়ে যায়; অন্যরা যেই পুণ্য কষ্ট বা পরিশ্রম করে করে, সে তা স্বচ্ছন্দে ও আনন্দের সাথে করে। আধ্যাত্মিকতার এই মানে পৌঁছলে পরে পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তিনি (আ.) বলেন, ইসলামের জন্য প্রকৃতির নিয়ম হল-একটি পুণ্য থেকে দ্বিতীয় পুণ্য সৃষ্টি হয়। তাযকেরাতুল আওলিয়াতে এরকম একটি ঘটনা রয়েছে যে এক অগ্নিপূজারী বৃদ্ধ টানা কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে করুণাবশতঃ পাখিদের খাবার দিচ্ছিল। এটি দেখে তার মুসলিম প্রতিবেশী তাকে বলে যে তার এরূপ করা বৃথা, কারণ কাফের হওয়ার কারণে সে এই কাজের কোন প্রতিদান পাবে না। অথচ পরবর্তীতে সেই বৃদ্ধকে ঐ মুসলিম ব্যক্তি হজ্জের সময় কাবা প্রদক্ষিণরত দেখতে পায়, আর বৃদ্ধও এসে তাকে বলে যে ‘আমার সেদিনের কাজের প্রতিদানে আল্লাহ্ আমাকে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করেছেন’। অতএব আল্লাহ্ যেখানে এক কাফেরের প্রতিদানও বিনষ্ট করেন না, সেখানে একজন মুসলিম কিভাবে তার পুণ্যের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে? বৈধ জিনিসের ব্যবহারও সীমার মধ্যে রাখা পুণ্যের কারণ, আর সেগুলোর সীমাতিরিক্ত ব্যবহার অন্যায়। আল্লাহ্ তা’লা এগুলোকে এজন্য বৈধ করেছেন যেন মানুষ পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকে ও চলতে পারে; যেমন এক ঘোড়ার গাড়ির মালিক অনেকটা পথ চলার পর ঘোড়াকে খেতে দেয় ও বিশ্রাম দেয়। কিন্তু এগুলোতেই মগ্ন হয়ে যাওয়াটা অন্যায়, কারণ তাতে জীবনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এজন্যই কুরআনে আল্লাহ্ বলেছেন, ‘ই’দিলূ হুয়া আকরাবু লিত্তাকওয়া’ অর্থাৎ মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, এটিই তাকওয়া। পুণ্যের পরিসর বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রেও তিনি (আ.) জোরালো নির্দেশ দান করে বলেন যে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না বা তাদের পিছনে নামায পড়বে না, কিন্তু তাদের সাথে সদ্ব্যবহার অতি অবশ্যই করবে। সদ্ব্যবহার ও সহমর্মিতা কোন ব্যক্তি বা জাতিতে সীমাবদ্ধ করবে না। হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ্ তা’লা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা তাঁর খাতিরে পুণ্য সম্পাদনকারী হতে পারি, আর আমাদের জন্য তিনি ‘ফাসতাবিকুল খাইরাত’-এর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তাতে যেন আমরা পৌঁছতে পারি। আমীন। খুতবার শেষদিকে হুযুর (আই.) তিনটি গায়েবানা জানাযার উল্লেখ করেন। প্রথম জানাযা প্রফেসর মাসুদ আহমদ আতেফ সাহেবের পুত্র জনাব আহমদ মাকসুদ আতেফ সাহেবের, যিনি একজন মুরব্বী সিলসিলা ছিলেন। দ্বিতীয় জানাযা তানজানিয়ার জনাব আলি সাঈদ মুসা সাহেবের, আর তৃতীয় জানাযা আরবী ডেস্কের ইনচার্জ আব্দুল মোমেন তাহের সাহেবের মা মোকাররমা নুসরত বেগম সাদেকা সাহেবার। হুযুর (আই.) প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত যিকরে খায়ের করেন এবং তাদের আধ্যাত্মিক পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দোয়া করেন।

খুতবাটি শেয়ার করুন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন