মুমিনদের সভা-সমাবেশ-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই:), খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

শুধু অডিও শুনুন

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ মসজিদ থেকে “মুমিনদের সভা-সমাবেশ-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন। তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর, হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন, পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন রয়েছে বা বিভিন্ন সংগঠনের উদ্দেশ্য বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কিছু সভা-সংগঠন পরামর্শের জন্য হয়ে থাকে; এগুলোতে পার্থিব বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে পরামর্শ করা হয়, কিন্তু খোদার সন্তুষ্টি বা নৈকট্য অর্জন এর উদ্দেশ্য থাকে না। কতিপয় সভা যদি মানবকল্যাণ নিয়ে আলোচনা করেও, তবুও তা পার্থিব উদ্দেশ্যেই করে, খোদার সন্তুষ্টির জন্য নয়। কিন্তু কতিপয় সভা এমনও আছে যেগুলোর উদ্দেশ্য ধর্মীয় হয়ে থাকে; খোদা তা’লার স্মরণকে প্রতিষ্ঠার বা মানুষকে আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী করার উপায় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার বা আধ্যাত্মিকতায় উন্নতি লাভের জন্য বা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিভাজন হবার উদ্দেশ্যে তারা এসব সভায় অংশ নেন। এককথায় এসব সভার উদ্দেশ্য কেবল এটিই হয়ে থাকে যে আমরা যা-ই করি বা যে পরিকল্পনাই করি তার উদ্দেশ্য যেন হয় আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন- এসব সভাই আল্লাহ্ পছন্দ করেন, আর এগুলোর সুফল এই পৃথিবীতেও প্রকাশ পায় আর এতে অংশগ্রহণকারীদের আল্লাহ্ মৃত্যুর পরও প্রতিদান দেন। তাই এক মুমিনের দায়িত্ব হল- স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঘরোয়া সভা হোক বা বাইরের কোন সভা হোক, সর্বক্ষেত্রে উদ্দেশ্য যেন এই হয় যে ‘আমরা কিভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করব, কিভাবে আধ্যাত্মিকতাকে রক্ষা করব ও এতে উন্নতি করব, নিজের ও অন্য মুমিনদের অবস্থার উন্নতি করব’। হুযুর (আই.) বলেন, একজন মুমিনের পার্থিব বিষয়াদিও আল্লাহ্‌র স্মরণ থেকে বিমুক্ত হয় না, তাতে অন্যায়-অসংগত কাজ বা অন্যের অধিকার হননের মত বিষয় থাকে না, বরং সর্বদা তাকওয়া ও খোদাভীতিকে দৃষ্টিপটে রাখা হয়- আর একজন মুমিনের কাছ থেকে এমনটিই প্রত্যাশিত। কুরআন শরীফেও আল্লাহ্ তা’লা মুমিনদের আলোচনা সভা কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে এমনটিই নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হে যারা ঈমান এনেছ! যখন তোমরা পরস্পর গোপন পরামর্শ কর তখন এ পরামর্শ যেন পাপ, সীমালংঘন ও রসূলের অবাধ্যতার উদ্দেশ্যে না হয়। বরং পুণ্য ও তাকওয়া সম্পর্কে পরামর্শ কর এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর, যাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।” (মুজাদিলা: ১০)। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল অধিকাংশ মুসলমান আজ এই নির্দেশকে ভুলে গেছে, আজ তারা একে অপরকে ধ্বংস করার বিষয়ে শলা-পরামর্শ করে। আল্লাহ্ তা’লা মুমিনদের চিহ্ণ হিসেবে ‘রুহামাউ বাইনাহুম’ বা পরস্পর ভালবাসাপূর্ণ ও দয়ার্দ্র হবার কথা বলেছেন, অথচ তাদের মধ্যে কাফেরদের মত ‘কুলুবুহুম শাত্তা’ বা পরস্পর দ্বিধাবিভক্ত অবস্থা দৃষ্টিগোচর হয়, আল্লাহ্‌কে ভয় করার বদলে পার্থিব বিভিন্ন শক্তি, সরকার ইত্যাদিকে ভয় করতে দেখা যায়। যদি মুসলমান রাজনীতিক বা উলামাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র খোদাভীতি থাকত তবে আজ এমন পরিস্থিতি হতো না। তাই এই যুগে আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হল একদিকে নিজেদেরকে এ ধরনের কর্মকান্ড ও চিন্তা-ভাবনা থেকে পবিত্র রাখা ও নিজেদের মাঝে তাকওয়া বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে যাদের সাথে উক্ত প্রকার নেতৃবৃন্দের সাথে সম্পর্ক রয়েছে তাদের উচিত নিজ নিজ গন্ডিতে যথাসম্ভব তাদেরকে এই কথা বোঝানো যে ‘তোমরা যা করছ তা ভুল; এমন কাজের ফলে তোমরা কেবল অন্যদের দাসেই পরিণত হবে না, বরং আল্লাহ্‌র ক্রোধেরও শিকার হবে এবং দুনিয়াও খোয়াবে’। হুযুর (আই.) জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সভায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তৃতার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, যদিও এতে সৌদি আরবের মত কতিপয় মুসলমান দেশ খুশি, কিন্তু খোদ পশ্চিমা বিশ্লেষকরাই এটির তীব্র সমালোচনা করছে ও এটি অশান্তি বৃদ্ধির কারণ হবে বলে মন্তব্য করছে। হুযুর (আই.) বলেন, এতো হল সাধারণ মুসলমানদের অবস্থা। কিন্তু আমাদের আহমদীদেরও নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে, কারণ শয়তান কখনোই এটি সহ্য করবে না যে জামাত উন্নতি করুক, সে সর্বদা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবেই। যারা একত্রে বসে স্থানীয় বা দেশীয় জামাতী ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সমালোচনামূলক কথায় লিপ্ত হয়, তারা আসলে শয়তানের ধোঁকায় নিপতিত হয়ে এমনটি করে। বাহ্যত তারা জামাতের মঙ্গল নিয়েই আলাপ করে আর ভাবে যে আসলেই এসব বিষয়ের সংশোধন প্রয়োজন; কিন্তু যদি সংশোধনই উদ্দেশ্য হতো তাহলে তো তা দেশীয় জামাতকে বা খলীফাকে জানানো দরকার, জানানোর পর তাদের দায়িত্ব শেষ- এর সমাধান জামাত বা খলীফা করবেন। হ্যাঁ, দোয়া প্রত্যেক্রেই করতে হবে যেন জামাত সবরকম সমস্যা ও ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকে, তবে এজন্য নিজেরা বসে আলোচনা করা শয়তানী কর্ম। এই সুযোগে জামাতের শত্রুরাও শুভাকাঙ্খীর ছদ্মবেশে এমন সব কথা আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দেবে যা বিশৃঙ্খলার কারণ হবে। হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ্ তা’লা জামাতকে ভিতর ও বাহিরের সকল ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন, আর পাপ-অবাধ্যতা-সীমালঙ্ঘনের পরিবর্তে সর্বদা পুণ্য ও তাকওয়ার সভা হওয়ার তৌফিক দিন। আমীন। এরপর হুযুর (আই.) আলোচনাসভার প্রকারভেদ ও অবস্থা বিষয়ে মহানবী (সা.) ও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন উদ্ধৃতি ও নির্দেশনা তুলে ধরেন। মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, যদি কোন স্থানে আল্লাহ্ ও রসূলকে নিয়ে ঠাট্ট-মশকরা হতে দেখ তবে হয় সেই সভা ছেড়ে উঠে যাও, যেন তুমিও তাদের অংশ না হও; নতুবা তাদের কথার স্পষ্ট ও পূর্ণ জবাব দাও, অন্যথায় তা মুনাফিকী হবে। মহানবী (সা.) এক সাহাবীর এই প্রশ্নের উত্তরে যে কেমন ব্যক্তির সান্নিধ্যে বসা উচিত, বলেন: “এমন লোকের সান্নিধ্যে বস যাকে দেখে তোমাদের আল্লাহ্‌র কথা স্মরণ হয়, যার আলাপ-চারিতার ফলে তোমাদের ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি হয়, আর যার কাজ তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করায়”। হুযুর (আই.) বলেন, এই নির্দেশ আমাদের অনুসরণ করতে হবে, অন্যরূপ সভা হলে সেই সভা তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করতে হবে। এমনটি করা হলে আমাদের যুবক ও বয়স্করাও অনেক রকম খারাপি ও বিশৃঙ্খলা থেকে বেঁচে যাবে। আমাদের সন্তানদের সঙ্গ কেমন তা সর্বদা পর্যবেক্ষণ করতে হবে ও অসৎ সঙ্গ থেকে তাদের বিরত রাখতে হবে। হাদীসে আছে যে যারা মসজিদে কুরআন পড়ে ও কুরআনের দরস ইত্যাদি দেয় বা শোনে তাদের উপর আল্লাহ্ শান্তি ও করুণা বর্ষণ করেন ও ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে। হুযুর (আই.) বলেন, জামাত এদিক থেকে সৌভাগ্যবান যে এরকমটি আমাদের জামাতে প্রায়শঃই করা হয়ে থাকে; তবে জামাত ও অংগসংগঠনগুলোর ইজতেমা ইত্যাদিতে এদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত যেন এরকম জ্ঞানবৃদ্ধিমূলক অনুষ্ঠান বেশি বেশি রাখা হয়। হাদীসে আছে যে ‘তোমরা মুমিন ছাড়া কারও সাথে বসো না আর মুত্তাকী ছাড়া কেউ যেন তোমাদের খাবার না খায়’। হুযুর (আই.) বলেন, এটাতো অসম্ভব যে কেউ অন্যদের সাথে কোনরকম যোগাযোগ বা উঠাবসাই করবে না, বরং তবলীগের জন্যও তো অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। আসলে এই হাদীসের অর্থ হল, অন্যদেরকে গভীর-অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। মসীহ্ মওউদ (আ.)-ও এটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে আত্মসংশোধনের একটি উপায় কুরআন অনুসারে ‘কুনু মাআস্ সাদিকীন’ অর্থাৎ তাদের সঙ্গ অবলম্বন কর যারা কথায়-কাজে-অবস্থায় সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, আর একথার পূর্বেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে ‘ইত্তাকুল্লাহ্’ যাতে মন্দ সঙ্গ থেকে বাঁচার দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ অন্যদের সাথে সম্পর্কে একটি সীমারেখা রাখতে হবে, তাদের বৃথা সভায় বসার পরিবর্তে তাদেরকে আমাদের উত্তম সভায় আনতে হবে। হাদীস থেকে জানা যায় সত্যবান ও পুণ্যবানদের সঙ্গ অবলম্বন করলে তাদের পুণ্যের ভাগীদার হওয়া যায়। মহানবী (সা.) যখন কোন মজলিস থেকে উঠতেন তখন দোয়া করতেন। এরূপ একটি দোয়া যা তিনি (সা.) সভা থেকে উঠার সময় তিনবার পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন তা হল: ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা’। হুযুর (আই.) দোয়া করেন, আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তৌফিক দিন যেন আমরা সর্বদা বাজে সভা থেকে বেঁচে চলতে পারি, আর যদি কখনো মনের অজান্তে তাতে অংশ নিয়েও ফেলি তবুও যেন এর অমঙ্গল থেকে নিরাপদ থাকি, সর্বদা পবিত্র সভার অনুসন্ধানী ও তাতে অংশগ্রহণকারী হই, সভার পবিত্রতা ও আল্লাহ্‌র দয়ার ভাগীদার হই; আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে শয়তানের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন, আমাদের সাথে ক্ষমা ও দয়ার আচরণ করেন, আমাদেরকে সর্বদা জামাত ও খেলাফতের সাথে সংযুক্ত রাখেন ও প্রত্যেক ফিতনাপরায়ণের অমঙ্গল থেকে নিরাপদ রাখেন। আমীন। খুতবার শেষে হুযুর (আই.) আমেরিকান আহমদী বিলাল আব্দুস সালাম সাহেবের, যিনি জন্মগত আমেরিকান ও খ্রীষ্টান ছিলেন ও পরবর্তীতে আহমদী হয়েছিলেন এবং গত ১৩ই সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন, তার গায়েবানা জানাযার উল্লেখ করেন ও সংক্ষিপ্ত যিকরে খায়ের ও দোয়া করেন।

খুতবাটি শেয়ার করুন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন