শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ – নিষ্ঠাবান সাহাবীগণ

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই:), খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

শুধু অডিও শুনুন

ডাউনলোড

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আমাদের প্রাণপ্রিয় ইমাম হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গতকাল ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯  টিলফোর্ডস্থ ইসলামাবাদের মসজিদে মুবারকে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় বদরের যুদ্ধে অংশ নেয়া সাহাবীদের স্মৃতিচারণ করেন। 

হুযুর (আই.) তাশাহহুদ, তাআ’ব্বুয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর বলেন, গত খুতবায় আমি হযরত হেলাল বিন উমাইয়া (রা.)’র স্মৃতিচারণ করছিলাম আর এতে তাবূকের যুদ্ধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছিল। হযরত হেলাল (রা.) সেই তিনজনের একজন ছিলেন যারা অকারণে তাবূকের যুদ্ধে যান নি, পরবর্তীতে সত্য স্বীকারের ফলে সাময়িক বয়কটের শাস্তি পান। ক্রমাগত তওবা ও ইস্তিগফারের ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাদের তওবা কবুল করে সূরা তওবার ১১৮নং আয়াত অবতীর্ণ করেন ও তাদের ক্ষমা করা হয়। এ প্রসঙ্গে এটিও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সাহাবীরা তাবূকের যুদ্ধের জন্য কীভাবে কুরবানী উপস্থাপন করেছিলেন আর মুনাফিকরা এতে অংশ তো নেয়-ই নি, উল্টো মহানবী (সা.)-এর কাছে মিথ্যা অজুহাত উপস্থাপন করে। এ প্রসঙ্গে আজকের খুতবায় আরও কিছু বিষয় হুযূর তুলে ধরেন।

হুযূর (আই.) বলেন, যারা মহানবী (সা.)-এর সাথে তাবূকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাকে নিরুৎসাহিত করছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল জাদ্দ বিন কায়স; সে নারীদের নিয়ে পরীক্ষায় পড়ার অজুহাত দেখিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে নিবেদন করে, ‘আমাকে পরীক্ষা বা নৈরাজ্যের মধ্যে ফেলবেন না।’ মহানবী (সা.) তাকে ছেড়ে দেন, কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা সূরা তওবার ৪৯নং আয়াতে তার মিথ্যাচারের বিষয়টি অবগত করে দেন। মদীনার এক ইহুদীর নাম ছিল সুয়াইলাম, সে-ও মুসলমানদেরকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা.) হযরত আম্মার (রা.)-কে পাঠিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা এসে ক্ষমা চাইতে শুরু করে; এ বিষয়টি আল্লাহ্ তা’লা সূরা তওবার ৬৪-৬৬নং আয়াতে জানিয়ে দেন। 

মহানবী (সা.) তাবূক থেকে ফেরার পথে মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছে বলেন, ‘মদীনায় এমন কিছু লোক রয়েছে যারা পুরো পথ তোমাদের সাথেই ছিল’; সাহাবীরা আশ্চর্য হন যে মদীনায় থাকলে তারা কীভাবে সফরে গেল? রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, ‘যদিও তারা মদীনায় ছিল, কিন্তু কোন অনিবার্য কারণে বা অসুস্থতাবশতঃ ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও যুদ্ধাভিযানে যেতে পারে নি, তাই আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।’ মদীনায় প্রবেশের পূর্বে রসূলুল্লাহ্ (সা.) আনসারদের সবগুলো গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব ক্রমানুসারে উল্লেখ করেন, এই ক্রমে প্রথমে ছিল বনু নাজ্জারের নাম। মহানবী (সা.)-কে স্বাগত জানানোর জন্য মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ‘সানিয়্যাতুল বিদা’ নামক স্থানে উপস্থিত হয় এবং ছোটরা ‘তালাআল বাদরু আলাইনা মিন সানিয়্যাতিল বিদা- ওয়াজাবাশ্ শুকরু আলাইনা- মা দা’আ লিল্লাহি দায়া’Ñ এই পংক্তিগুলো পড়ে তাঁকে (সা.) স্বাগত জানায়। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর মদীনায় হিজরত করে আসার সময় এই পংক্তিগুলো পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা হযরত আয়েশা (রা.)-এর বরাতে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীর অভিমত হল, এই বর্ণনা খুব সম্ভব তাবূকের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়ের ঘটনা, ইমাম বায়হাকীরও একই অভিমত। রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রীতি ছিল, কোন সফর থেকে ফিরলে প্রথমে তিনি মসজিদে যেতেন এবং দু’রাকাত নামায পড়তেন; তাবূক থেকে ফিরেও তিনি (সা.) এরূপ করেন এবং তখনই মুনাফিকরা ও সেই তিনজন সাহাবী এসে তাঁর (সা.) সাথে দেখা করেন।

পরবর্তী সাহাবী হযরত মুরারা বিন রবী’ আমরী (রা.), তার পিতার নাম ছিল রবী’ বিন আদী। হযরত মুরারা আনসারদের অওস গোত্রের বনু আমর বিন অওফ শাখার সদস্য ছিলেন, আরেক বর্ণনামতে তিনি এদের গ্রাম্য শাখা কুযাআর লোক ছিলেন। হযরত মুরারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন, বুখারী ও অন্যান্য গ্রন্থে এর প্রমাণ পাওয়া যায়; যদিও ইবনে হিশাম তাকে বদরী সাহাবীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করেন নি। তিনিও সেই তিনজন আনসার সাহাবীর একজন ছিলেন যারা তাবূকের যুদ্ধে কোন বৈধ কারণ ছাড়াই অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যাদের তওবা গৃহীত হবার ব্যাপারে সূরা তওবার ১১৮নং আয়াত অবতীর্ণ হয়। হযরত কা’ব বিন মালেকের বর্ণনায় তার নামও এসেছে, যা গত জুমুআয় হযরত হেলাল (রা.)’র স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। 

পরবর্তী সাহাবী হযরত উতবা বিন গাযওয়ান (রা.), তার ডাকনাম ছিল আবু আব্দুল্লাহ্ ও আবু গাযওয়ান। তিনি নওফেল বিন আবদে মানাফ গোত্রের মিত্র ছিলেন, তার পিতার নাম ছিল গাযওয়ান বিন জাবের। হযরত উতবা আরদা বিনতে হারিসকে বিয়ে করেছিলেন। হযরত উতবা স্বয়ং বলেন, তিনি ইসলাম-গ্রহণকারীদের মধ্যে সপ্তম ব্যক্তি ছিলেন। ইবনে আসীরের মতে, হযরত উতবা যখন ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন তখন তার বয়স ছিল ৪০ বছর, যদিও ইবনে সা’দের মতে মদীনায় হিজরতের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর। ইথিওপিয়া থেকে ফিরে তিনি মহানবী (সা.)-এর সঙ্গেই ছিলেন, যদিও মদীনায় হিজরতের সময় তার পক্ষে হিজরত করা সম্ভবপর হয় নি। পরবর্তীতে ইকরামা বিন আবু জাহল যখন মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করে, তখন তিনি ও হযরত মিকদাদ বিন আমর একসাথে সেই বাহিনীতে যোগ দেন, যদিও তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সুযোগ বুঝে মুসলমানদের সাথে গিয়ে মিলিত হওয়া। অতঃপর যখন মহানবী (সা.) প্রেরিত মুসলমান বাহিনীর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়ে যায়, তখন তারা দু’জন সুযোগ পান এবং কাফিরদের দল ত্যাগ করে মুসলমানদের সাথে গিয়ে যোগ দেন। মহানবী (সা.) হযরত উবায়দা বিন আল্ হারেসের নেতৃত্বে ষাটজন উষ্ট্রারোহীর এই দলটি প্রেরণ করেন, যারা মদীনা থেকে দু’শ মাইল দূরবর্তী ‘সানিয়্যাতুল মারা’ নামক স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অতঃপর ইকরামার বাহিনীর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়; কিন্তু কোন যুদ্ধ তাদের মধ্যে হয় নি, কেবল হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস একটি তীর ছোঁড়েন, যা ইসলামের পক্ষে ছোঁড়া প্রথম তীর ছিল। এটি দ্বিতীয় হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়। প্রসঙ্গত হুযূর (আই.) ‘সীরাতে খাতামান্নাবীঈন’ পুস্তক থেকে এমন অভিযাত্রী দল প্রেরণের বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেন।

দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসের ১২ তারিখে তরবারির জিহাদ সংক্রান্ত প্রথম নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। মহানবী (সা.) কাফিরদের আক্রমণ থেকে মুসলমানদের রক্ষার ব্যাপারে চার প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যা ছিল তাঁর (সা.) রাজনৈতিক ও রণকৌশল বিষয়ক বিচক্ষণতা ও সূ²দর্শিতার পরিচায়ক। প্রথমতঃ তিনি (সা.) স্বয়ং নিকটবর্তী গোত্রসমূহের সাথে পারস্পরিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে গিয়ে চুক্তি করেছিলেন, যেন মদীনা-সংলগ্ন এলাকা নিরাপদ থাকে। এতে কুরাইশদের সিরিয়াগামী কাফেলাগুলো পথিমধ্যে যেসব গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার সম্ভাবনা ছিল এবং যাদের শত্রæতা মুসলমানদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হবার সম্ভাবনা ছিল, সে আশংকা কমে যায়। দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল, মদীনার চতুষ্পার্শ্বে সাহাবীদের ছোট ছোট সংবাদ-সংগ্রহকারী দল প্রেরণ, যেন কুরাইশদের গতিবিধি সম্পর্কে জানা যায়, আর কুরাইশরাও বুঝতে পারে যে, মুসলমানরা একেবারে অপ্রস্তুত নয়। এভাবে তাদের অকস্মাৎ আক্রমণের সম্ভাবনাও কমে যায়। এসব অভিযাত্রী দল প্রেরণের মাধ্যমে তৃতীয় যে কাজটি তিনি (সা.) করেন তা হল, মক্কা ও এর আশেপাশে বসবাসরত দুর্বল মুসলমানদের জন্য হিজরত করে মদীনায় আসার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেন। বস্তুত উবায়দা বিন আল্ হারেসের নেতৃত্বে যাওয়া দলটিও এ কারণেই প্রেরিত হয়েছিল। চতুর্থ পদক্ষেপ ছিল, তিনি (সা.) মদীনার আশপাশ দিয়ে সিরিয়া অভিমুখে যাওয়া কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাকে বাঁধা দেওয়া। এর কারণ ছিল, এসব কাফেলা যেখান দিয়েই যেত, পথিমধ্যে বসবাসকারী গোত্রগুলোকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কে দিত; আবার এই কাফেলাগুলো অস্ত্র-শস্ত্রেও সজ্জিত হতো, ফলে যেকোন সময় তাদের পক্ষ থেকে আক্রমণেরও আশংকা থাকতো। উপরন্তু, যেহেতু মক্কার কুরাইশদের পেশাই ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, তাই তারা ব্যবসার মুনাফা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতো এবং ব্যবসায় মন্দা তাদের ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই ও ষড়যন্ত্র করার শক্তি হ্রাসের কারণ ছিল।

হিজরতের পর মহানবী (সা.) হযরত আবু দাজানাকে হযরত উতবা (রা.)’র ধর্মভাই বানিয়ে দেন। হুযূর (আই.) বলেন, তার সম্বন্ধে আরও কিছু বিবরণ রয়েছে যা পরবর্তী খুতবায় বর্ণনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ্। 

এরপর হুযূর দৈনিক আল্ ফযল সম্পর্কে একটি বিশেষ ঘোষণা প্রদান করেন যে, দৈনিক আল্ ফযলের ১০৬তম বর্ষপূর্তিতে লন্ডন থেকে দৈনিক আল্ ফযলের অনলাইন সংস্করণ শুরু হতে যাচ্ছে, যা জুমুআর পর উদ্বোধন করা হবে। ১৮ই জুন, ১৯১৩ সালে হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.)-এর দোয়া ও অনুমতিক্রমে এর প্রকাশনা শুরু করেন, পাকিস্তান হওয়ার পর কিছুদিন লাহোর থেকে ও পরবর্তীতে রাবওয়া থেকে তা নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে। এখন থেকে এটি ওয়েবসাইট, টুইটার, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ্। 

এছাড়া খুতবার শেষ দিকে হুযূর দু’টি গায়েবানা জানাযারও ঘোষণা দেন; প্রথম জানাযা শ্রদ্ধেয়া সৈয়দা তানভিরুল ইসলাম সাহেবার, যিনি শ্রদ্ধেয় মির্যা হাফিয আহমদ সাহেব মরহুমের সহধর্মিনী ছিলেন, গত ৭ই ডিসেম্বর ৯১ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান সাহাবী মীর হিসামুদ্দীন সাহেবের প্রপৌত্রি ছিলেন, তিনি খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)’র পুত্রবধুও ছিলেন। মরহুমার একটি বিশেষ গুণ ছিলÑ তিনি তাহাজ্জুদে খুবই নিয়মিত ছিলেন, এমনকি যেদিন মৃত্যুবরণ করেন সেদিনও রাত ৩টায় উঠে তাহাজ্জুদ পড়েন ও তারপর ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘকাল বিভিন্ন পদে থেকে জামাতের সেবা করে গেছেন।

দ্বিতীয় জানাযাটি হল, আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির বাসিন্দা সিস্টার হাজা শুকুরা নূরিয়া সাহেবার, যিনি গত ১লা ডিসেম্বর ৯২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মরহুমা জন্মগতভাবে খ্রিস্টান ছিলেন, কিন্তু সত্যের অন্বেষণে আহমদীয়াতের সন্ধান পান, ১৯৭৯ সালে স্বপ্নের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা পেয়ে আহমদীয়াত গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন। মরহুমা পর্দার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন, তবলীগের ক্ষেত্রে একজন আদর্শ ছিলেন; তিনি হুযূরের খুতবা ও বাজামাত নামাযের ব্যাপারে খুবই মনোযোগী ছিলেন। তিনি বিভিন্নভাবে জামাতের সেবা করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। হুযূর উভয় মরহুমার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন ও তাদের পদমর্যাদা উন্নত হওয়ার জন্য দোয়া করেন, তাদের পরিবারবর্গের জন্যও হুযূর দোয়া করেন।

খুতবাটি শেয়ার করুন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন