শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ – নিষ্ঠাবান সাহাবীগণ

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই:), খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস
১৭ জানুয়ারী, ২০২০

শুধু অডিও শুনুন

ডাউনলোড

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আমাদের প্রাণপ্রিয় ইমাম হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গতকাল ১০ই জানুয়ারি, ২০২০ টিলফোর্ডস্থ ইসলামাবাদের মসজিদে মুবারকে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় পুনরায় বদরের যুদ্ধে অংশ নেয়া সাহাবীদের স্মৃতিচারণ করেন। 

তাশাহহুদ, তাআ’ব্বুয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর (আই.) প্রথমে গত শুক্রবার ওয়াকফে জাদীদের নববর্ষ ঘোষণায় প্রদত্ত একটি তথ্যের সংশোধন করেন; যুক্তরাজ্যে চাঁদা সংগ্রহের দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় জামাতগুলোর মধ্যে প্রথম হয়েছে অল্ডারশট জামাত ও দ্বিতীয় ইসলামাবাদ জামাত। ভুলবশত প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল ইসলামাবাদ জামাতকে। হুযূর আরও বলেন, বিগত খুতবায় উল্লিখিত বেশিরভাগ ঘটনা ছিল বিভিন্ন গরীব দেশের দরিদ্র আহমদীদের, এর উদ্দেশ্য হল, ধনীদের মাঝেও যেন সচেতনতা সৃষ্টি হয় আর তারাও ত্যাগের স্পৃহায় উদ্বুদ্ধ হয়। নতুবা আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় এসব উন্নত দেশেও এমন অনেক আহমদী রয়েছেন যারা নিজেদের পার্থিব চাহিদাকে উপেক্ষা করে আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করেন। 

এরপর হুযূর আজকের খুতবার মূল বিষয় অর্থাৎ বদরী সাহাবীদের স্মৃতিচারণ আরম্ভ করেন, এ বিষয়ে প্রদত্ত সর্বশেষ খুতবায় হযরত সা’দ বিন উবাদাহ্ (রা.)’র স্মৃতিচারণ চলছিল। তার স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রেও হুযূর একটি সংশোধনী উপস্থাপন করেন যা রিসার্চ সেল নিজ থেকেই প্রেরণ করেছে। রিসার্চ সেল অনেক পরিশ্রম করে সাহাবীদের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত খুঁজে বের করেন, তবে মাঝে মাঝে তাড়াহুড়োর কারণে দু’জন সাহাবীর সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনাকে তারা গুলিয়ে ফেলেন। তেমনিভাবে মাঝে মাঝে আরবী থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত শব্দচয়ন না করার কারণে প্রকৃত বিষয় স্পষ্ট হয় না। উদাহরণস্বরূপ, গত ২৭শে ডিসেম্বরের খুতবায় বর্ণিত হয়েছিল, মহানবী (সা.) হযরত সা’দ ও হযরত তুলায়ব বিন উমায়ের (রা.)’র মাঝে ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন স্থাপন করেছিলেন, তবে কারও কারও মতে তার ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়েছিল হযরত আবু যার গিফ্ফারী (রা.)’র সাথে; এ সংক্রান্ত বিবরণটি আসলে হযরত মুনযের বিন আমর (রা.)’রÑ যা গত ২৫শে জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখের খুতবায় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিবরণটি যে পুস্তক থেকে নেয়া হয়েছে, সেখানে সা’দ বিন উবাদাহ্র উল্লেখ ছিল, তাই ভুলক্রমে এই তথ্যটি তার সম্পর্কেও মনে করা হয়েছিল।

এরপর হযরত সা’দ বিন উবাদাহ্ (রা.)’র স্মৃতিচারণ করতে হুযূর বলেন, খন্দকের যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.) গাতফান গোত্রের নেতা উয়্যেইনা বিন হিছনকে এই শর্তে মদীনার এক-তৃতীয়াংশ খেজুর প্রদান করার প্রস্তাব নিয়ে ভাবেন যে, সে গাতফান গোত্রের বাকি লোকদের নিয়ে ফেরত যাবে; তিনি (সা.) এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য হযরত সা’দ বিন মুআয ও সা’দ বিন উবাদাহ্কে ডাকেন। কারণ যত দিন যাচ্ছিল, মুসলমানরা তাদের ঈমানের দৃঢ়তা সত্ত্বেও শারীরিকভাবে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ছিল। এছাড়া তাঁর (সা.) মনে এই চিন্তাও ছিল যে, আনসাররা হয়তো এত দীর্ঘ অবরোধের কারণে অধৈর্য হয়ে পড়তে পারে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি চাইতে পারে; তাই আনসারদের মানসিক অবস্থা ও মনের জোর জানার উদ্দেশ্যেও তিনি তাদের সিদ্ধান্ত জানতে চাইছিলেন। কিন্তু উভয় সা’দ একবাক্যে রসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহ্'র রসূল! যদি এটি আল্লাহ্'র সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তবে তা-ই শিরোধার্য, আপনি এটি-ই করুন। কিন্তু যদি তা না হয় তাহলে আল্লাহ্'র কসম, আমরা তাদেরকে তরবারীর আঘাত বৈ আর কিছুই দিব না (অর্থাৎ তাদের সাথে লড়াই চালিয়ে যাব); প্রচলিত রীতি অনুসারে তাদের যে শাস্তি প্রাপ্য তারা তা-ই পাবে।’ রসূলুল্লাহ্ (সা.) জানান, এটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত, আল্লাহ্'র নির্দেশ নয়। তখন তারা দু’জন বলেন, ‘অজ্ঞতার যুগেই যেখানে তাদের এরূপ আশা করার সাহস হয় নি, সেখানে আপনার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে হিদায়াত দেয়ার বা সুপথ প্রদর্শনের পর এটি কীভাবে সম্ভব হতে পারে?’ তাদের দু’জনের এই উত্তরে মহানবী (সা.) আনন্দিত হন।

খন্দকের যুদ্ধের বর্ণনায় হযরত মির্যা বশীর আহমদ সাহেব (রা.) ‘সীরাত খাতামান্নবীঈন’ পুস্তকে লিখেছেন, আবু সুফিয়ান এই কূটচাল চালে যে, বনু নাযির গোত্রের প্রভাবশালী নেতা হুয়াই বিন আখতাবকে দিয়ে বনু কুরায়যার ইহুদীদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার প্রস্তাব পাঠায়। হুয়াই বনু কুরায়যার নেতা কা’ব বিন আসাদকে এই প্রস্তাব দিলে প্রথমে সে অসম্মতি জানায়, কারণ মহানবী (সা.) বরাবর অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। কিন্তু হুয়াই বিন আখতাবের উস্কানিতে অবশেষে সে সম্মত হয়। মহানবী (সা.) বনু কুরায়যার এই বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ জানতে পেরে প্রথমে যুবায়ের ইবনুল আওয়ামকে গোপনে খোঁজ নিতে পাঠান, নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি (সা.) সা’দ বিন উবাদাহ্ ও সা’দ বিন মুআয এবং আরও কতিপয় প্রভাবশালী আনসার সাহাবীকে পাঠান। ইহুদীরা অনুতাপ প্রকাশের পরিবর্তে উল্টো ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, তাদের নেতা কা’ব বিন আসাদ দুই সা’দকে বলে বসে, ‘চলে যাও, মুহাম্মদ (সা.) ও আমাদের মধ্যে কোন সন্ধিচুক্তি নেই!’ বনু কুরায়যার সাথে যুদ্ধের সময় হযরত সা’দ বিন উবাদাহ্ কয়েকটি উট বোঝাই খেজুর মুসলমানদের খাওয়ার জন্য প্রদান করেন; তখন মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘খেজুর কতই না উত্তম খাবার।’

মক্কা বিজয়ের জন্য মহানবী (সা.) মুসলিম বাহিনী নিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছলে আবু সুফিয়ান এবং আরও দু’জন কাফির নেতা রাতের আঁধারে খোঁজ নিতে আসে। মুসলিম বাহিনীর প্রহরীরা তাদের দেখতে পেলে মহানবী (সা.)-এর কাছে ধরে নিয়ে আসে। তখন আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে। মহানবী (সা.) পরদিন মক্কা অভিমুখে যাত্রার সময় হযরত আব্বাসকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন আবু সুফিয়ানকে নিয়ে পথের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন আর সে মুসলিম বাহিনীর বিশালতা দেখতে পায়। মুসলিম বাহিনীর একেকটি দল অতিক্রম করছিল আর আবু সুফিয়ান আশ্চর্য হয়ে দেখছিল ও হযরত আব্বাসকে সেই দলের পরিচয় জিজ্ঞেস করছিল। প্রায় দু’সহস্রাধিক আনসার ও মুহাজিরদের দল যখন অতিক্রম করছিল, তখন তাদের দেখে আবু সুফিয়ান মন্তব্য করে, পৃথিবীতে এদের সাথে লড়াই করার মত সাধ্য কোন সৈন্যদলের নেই। আনসারদের পতাকা ছিল সা’দ বিন উবাদাহ্'র কাছে, তিনি আবু সুফিয়ানকে ডেকে বলেন, আজ লড়াই করে মক্কা দখল করে নেয়ার দিন এবং আজ কা’বার কাছে লড়াই করা বৈধ হবে। আবু সুফিয়ান যদিও মুসলমান হয়েছিল, কিন্তু এই কথা শুনে সে খুবই ভীত হয়। কিছুক্ষণ পর যখন মহানবী (সা.) সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন সে সা’দের এই কথা মহানবী (সা.)-কে বলে এ কথার সত্যতা জানতে চায়। মহানবী (সা.) বলেন, সা’দ ভুল বলেছে, আজ তো সেই দিন- যেদিন আল্লাহ্ তা’লা কা’বার সম্মান প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তাতে পর্দা চড়ানো হবে; কোন যুদ্ধ হবে না। অতঃপর মহানবী (সা.) সা’দের কাছে দূত মারফত এই নির্দেশ পাঠান যে, তিনি যেন পতাকা তার ছেলে কায়েসের হাতে দিয়ে দেন এবং নেতৃত্ব তার ছেলের হাতে প্রদান করেন। এভাবে মহানবী (সা.) মক্কাবাসীদেরও মন শান্ত করেন এবং আনসারদেরও খুশি রাখেন।

৮ম হিজরির শওয়াল মাসে সংঘটিত হুনায়নের যুদ্ধে পাওয়া যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ মহানবী (সা.) সম্পূর্ণ মুহাজিরদের মাঝে বন্টন করে দেন, আনসারদের কিছু দেন নি। এতে তাদের মাঝে কিছুটা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের পক্ষ থেকে সা’দ বিন উবাদাহ্ মহানবী (সা.)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। রসূলুল্লাহ্ (সা.) আনসারদের পক্ষ থেকে এসব শুনে কষ্ট পান এবং আনসারদেরকে জড়ো করতে বলেন। এরপর তিনি (সা.) তাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় মর্মস্পর্শী বক্তব্য রাখেন, এর এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘হে আনসাররা! তোমরা কি এতে আনন্দিত নও যে, অন্যরা গরু-ছাগল-উট নিয়ে বাড়ি ফিরবে, আর তোমরা আল্লাহ্র রসূলকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবে?’ তাঁর (সা.) ভাষণে আবেগাপ্লুত হয়ে আনসাররা কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেলেছিলেন এবং বলেছিলেন, রসূলুল্লাহ্ (সা.) যেভাবে বন্টন করেছেন আর আমাদের ভাগে যা রেখেছেন, আমরা তাতে যারপরনাই সন্তুষ্ট।

বিদায় হজ্জের সময় পথিমধ্যে মহানবী (সা.)-এর বাহন উটটি হারিয়ে গিয়েছিল। হযরত সা’দ ও তার পুত্র কায়েস সফরের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সহ তাদের নিজেদের বাহন নিয়ে এসে উপস্থিত হন এবং তাঁকে (সা.) তা গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। যেহেতু ইতোমধ্যে মহানবী (সা.)-এর উটটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তাই তিনি তাদের নিরস্ত করেন এবং তাদের জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর এক দৌহিত্রের মৃত্যুর সময় হযরত সা’দ এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী তাঁর (সা.) সাথে সেই মুমূর্ষ শিশুকে দেখতে গিয়েছিলেন। মৃত্যুপথযাত্রী শিশুকে মহানবী (সা.)-এর কোলে দেয়া হলে তাঁর (সা.) চোখ অশ্রসিক্ত হয়ে পড়ে। হযরত সা’দ বলেন, ‘হে আল্লাহ্'র রসূল, এ কী!’ মহানবী (সা.) বলেন, ‘এটা সেই দয়া যা আল্লাহ্ তাঁর বান্দার হৃদয়ে সৃষ্টি করেছেন; আর আল্লাহ্ও নিজ বান্দাদের মধ্যে তাদের প্রতিই দয়া করেন, যারা অন্যদের প্রতি দয়া করে।’ রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আরও কতিপয় হাদীস থেকে জানা যায়, প্রিয়জনের মৃত্যুতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া বা অশ্রবিসর্জনে কোন বারণ নেই, তবে আল্লাহ্ তা’লার সিদ্ধান্তের প্রতি মনে অভিযোগ বা অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়া পাপ। হযরত সা’দ বিন উবাদাহ্ (রা.)’র দোয়া করার একটি বিশেষ রীতি ছিল, তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ্! আমাকে প্রশংসাযোগ্য বানিয়ে দাও এবং আমাকে সম্মান ও প্রতিপত্তি দান কর; আর সৎকাজ ছাড়া সম্মান ও প্রতিপত্তি অর্জন করা যায় না, আর সৎকাজ সম্পদ ছাড়া করা সম্ভব না। হে আল্লাহ্! স্বল্প সম্পদ আমার জন্য যথেষ্ট না, আর স্বল্পে আমি তুষ্ট থাকতেও পারব না।’

মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় যে ছয়জন আনসার সাহাবী কুরআন মুখস্ত করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন হযরত সা’দ বিন উবাদাহ্ (রা.)। 

হুযুর বলেন, তার স্মৃতিচারণের কিছু অংশ এখনও বাকি আছে, পরবর্তীতে বর্ণনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ্।

খুতবাটি শেয়ার করুন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন